বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রিটেনে পোস্ট স্টাডি ওয়ার্ক ভিসার নতুন ঘোষণা

ব্রিটেনে স্টাডি ওয়ার্ক ভিসার জন্য নতুন করে অভিবাসন নীতি ঘোষণা করেছে বরিস জনসনের সরকার। কম দক্ষদের চেয়ে ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দক্ষ কর্মীদের এবং প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থীদের অভিবাসী হিসেবে ব্রিটেনে আসার সুযোগ করে দিতেই নতুন অভিবাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে দেশটি। পাশাপাশি ইয়ুথ মোবিলিটি অ্যাগ্রিমেন্টে’র অধীনে প্রতিবছর ২০ হাজার তরুণকে ব্রিটেনে আসার সুযোগ করে দেয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। নতুন এই নিয়মে ইইউ এবং নন ইইউসহ সব অভিবাসী সমান সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে। এই নতুন সুযোগ বিশেষ করে ভারতীয় ও বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় উৎসাহের বিষয়। অপরদিকে ব্রিটিশ সরকার গত বছর ২ বছরের পোস্ট স্টাডি ও  ওয়ার্ক ভিসার ঘোষণা করেছিল। প্রকৃত মেধাবী বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রিটেনে সফল ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে এই ঘোষণার মধ্যদিয়ে। ব্রিটিশ হাই কমিশন নয়াদিল্লি সূত্রে এই খবর জানাযায়। নতুন অভিবাসন নিয়মে অদক্ষ কর্মীদের জন্য ব্রিটেনে আসা খুব কঠিন হবে। বিদেশী সব অভিবাসীকে ব্রিটেনে আসতে হলে অবশ্যই ইংরেজীতে কথা বলা পারতে হবে। কেউ ব্রিটেনে আসতে চাইলে তাকে অবশ্যই কমপক্ষে ২৫ হাজার ৬০০ পাউন্ড বেতনের একটি চাকরির অফার নিয়ে আসতে হবে। তবে নার্স বা এরকম কিছু চাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় ন্যূনতম বেতন ২০ হাজার ৪৮০ পাউন্ড এবং দক্ষতার ক্ষেত্রেও কিছুটা ছাড় দেয়া হতে পারে নতুন নিয়মে। আর পারিবারিক ভিসার জন্য পরিবারের কিছু সদস্যকে ব্রিটেনে আনতে সক্ষম হতে হলে তাকে সর্বনিম্ন বেতন ১৮ হাজার ৬০০ পাউন্ড দেখাতে হবে।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্যা গার্ডিয়ানের পলিটিকেল এডিটর হিদার স্টুয়ার্ট এর এক রিপোর্ট সূত্রে জানাযায়, ব্রিটিনে কাজ করার জন্য চলতি বছরের জানুয়ারিতে নতুন করে টায়ার ২ ভিসা চাইছেন এমন নন-ইইউ নাগরিকদের জন্য বর্তমানে ৩০ হাজার বাৎসরিক বেতন পাউন্ড সীমা প্রয়োগ করা হয়েছে। বরিস জনসনের সরকার নতুন ব্রেক্সিট পরবর্তী অভিবাসন ব্যবস্থার দক্ষ কর্মীদের বিতর্কিত ৩০ হাজার পাউন্ডের বেতনের সমাপ্তি হতে পারে বলে সরকারি সূত্র নিশ্চিত করেছে। স্বতন্ত্র মাইগ্রেশন উপদেষ্টা কমিটি (ম্যাক) এই অভিবাসন নিয়মটি বজায় রাখতে হবে কিনা সে বিষয়ে শীঘ্রই রিপোর্ট করবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারি সূত্রগুলি জানিয়েছে, ডাউনিং স্ট্রিট অভিবাসন নীতে একটি অস্ট্রেলিয়ান স্টাইলে পয়েন্ট ভিত্তিক সিস্টেম চালু করা নিয়ে আরও বিশদ বিবরণ প্রকাশ করবে।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্যা গার্ডিয়ানের সূত্রে জোনাথন পোর্টেস বলেন, আমরা সবসময় বলেছিলাম যে তাদের পরিকল্পনা অকার্যকর, কারণ বেসরকারি ও সরকারি খাতের অনেক নিয়োগকারীকে সরকার ‘স্বল্প দক্ষ কর্মী’ বলার জন্য যা জোর দিয়েছিল তা প্রয়োজন, তবে সমস্ত কর্মীদের উপযুক্ত বেতনের, যুক্তিসঙ্গত শর্তাদি, পারিবারিক জীবনের অধিকার এবং ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারগুলি যেখানেই হোক না কেন প্রয়োজন। আমরা তাদের পক্ষে লড়াই চালিয়ে যা। গত জুনে ম্যাককে সরকার কর্তৃক বেতন থ্রেশহোল্ডের প্রশ্ন এবং পয়েন্ট-ভিত্তিক সিস্টেম কীভাবে কাজ করতে পারে তা পরীক্ষা করে দেখার জন্য বলা হয়েছিল।

ব্রিটিশ হাই কমিশন নয়াদিল্লি সূত্রে আরও জানাযায়, নতুন এই ঘোষণা ‘গ্র্যাজুয়েট’ ডিগ্রীধারী সকল আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বিশেষ করে যারা ভারত থেকে পড়াশোনা করার জন্য ইউকে আসতে চাই। এবং যাঁরা শিক্ষার্থী হিসাবে যুক্তরাজ্যের বৈধ অভিবাসন মর্যাদা পেয়েছেন এবং সফলভাবে পড়াশোনা কোর্সটি সম্পন্ন করেছেন, অনুমোদিত ইউকে উচ্চশিক্ষা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক স্তরের বা তারপরের কোনও স্তরের বিষয়ে। ভিসার যোগ্য শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করে দুই বছরের জন্য উপযুক্ত ক্যারিয়ারে বা যে কোনও পেশায় বা অবস্থানের জন্য কাজ করতে বা কাজ সন্ধানের অনুমতি দেবে। এটি ইউকে সরকারের সেরা পদকে নিয়োগের জন্য এবং উজ্জ্বল বৈশ্বিক প্রতিভা বজায় রাখতে সহায়তা করবে পাশাপাশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিভা যুক্তরাজ্যের কাছে নিয়ে আসে এমন অন্যান্য বিশ্ব-নেতৃত্বাধীন কাজের ভবিষ্যতের সাফল্যের সুযোগ উন্মুক্ত করার জন্য এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ইউকে সরকার।

ভারতে ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্যার ডমিনিক অ্যাসকিথ বলেছিলেন, ভারতীয় ছাত্রদের জন্য এটি চমৎকার এক সংবাদ, যারা ডিগ্রি শেষ করার পরেও এখন যুক্তরাজ্যে আরও বেশি সময় অতিবাহিত করতে সক্ষম হবে, তাদের আরও অর্জন করার সুযোগ দেবে ক্যারিয়ারের দক্ষতায় এবং অভিজ্ঞতায়। ব্রিটেন বিশ্বের কয়েকটি সেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আদিনিবাস এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানায় এইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার জন্য।

আমি খুশি যে ব্রিটেনে পড়াশোনা করতে আসা ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, গত তিন বছরে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। কেবলমাত্র গত বছর এক বছরে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাই ৪২%। এই উত্তেজনাপূর্ণ ঘোষণাটি নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে যে ইউকে বিশ্বব্যাপী শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম সেরা গন্তব্যস্থল। যুক্তরাজ্যে যেসব ইতিবাচক অবদান রয়েছে তার জন্য ব্রিটিশ সরকার ভারত এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রকৃত শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানায়।

ব্রিটেনের বিরোধী লেবার পার্টি সরকারের এ পরিকল্পনার সমালোচনা করে বলছে, নতুন এ নিয়মের ফলে সৃষ্ট ‘প্রতিকূল পরিবেশ’ শ্রমিকদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেছেন, নতুন অভিবাসন নীতিতে প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থী ও  কর্ম দক্ষ মানুষরা যুক্তরাজ্যে আসার সুযোগ পাবেন। নতুন নীতিতে দেশটি নিয়োগকর্তাদের ইউরোপের সস্তা শ্রমিকদের ওপর থেকে নির্ভরশীলতা পরিত্যাগ, স্থানীয় কর্মী ধরে রাখা এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর বিনিয়োগ বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছেন।

হোম সেক্রেটারি প্রীতি প্যাটেল আরও বলেন, নতুন স্নাতক স্তর বলতে বুঝানো হয়েছে মেধাবী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের, বিজ্ঞান ও গণিতে হোক না বা প্রযুক্তি এবং প্রকৌশল বিষয়ে যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করতে পারবে এবং তারপরে সফল ক্যারিয়ার গড়তে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে মূল্যবান কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। এটি নিশ্চিত করে যে আমাদের বিশ্বব্যাপী দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করি এবং আমরা সেরা উজ্জ্বলতমকে আকর্ষণ করে চলেছি।

এদিকে সরকারের নতুন এই অভিবাসন পরিকল্পনায় বিদেশি শ্রমিকরা যুক্তরাজ্যে আসতে বা থাকতে চাইলে তাদের ৭০ নম্বর অর্জন করতে হবে। কেউ ২৫ হাজার ৬০০ পাউন্ডের বেশি আয় করলে তিনি ২০ নম্বর পাবেন। ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতা থাকলে ২০ এবং কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন পেয়ে চাকরিতে নিয়োগ পেলে ২০ নম্বর। এছাড়া বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি থাকলে ১০ বা ২০ নম্বর এবং শ্রমিক ঘাটতি আছে এমন খাতে কাজ করায় দক্ষ হলে ২০ নম্বর পাবেন। নতুন পরিকল্পনায় স্বল্প দক্ষ শ্রমিকদের জন্য কোনো সুযোগ থাকবে না বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। ইইউ সদস্য রাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে অবাধ চলাচল শেষ হওয়ার পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিতে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরামর্শও দিয়েছে তারা।

যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য গত তিন বছরের তুলনায় ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে এই বছর, যা ২০১৯ সালের জুনের শেষে এই সংখ্যা প্রায় ২২,০০০ পৌঁছেছে।   এটি আগের বছরের তুলনায় ৪২% বৃদ্ধি এবং তিন বছর আগের তুলনায় প্রায় ১০০% বেশি। এছাড়াও, যুক্তরাজ্যের ভিসার জন্য আবেদনকারী সকল ভারতীয়দের মধ্যে ৯৬% সফলভাবে ভিসা পেয়েছেন, যার অর্থ যুক্তরাজ্যে আসতে চান তাদের বেশিরভাগই আবেদন করে সক্ষম হন।

এই ঘোষণাটি একটি নতুন দ্রæত ফাস্ট ট্র্যাক ভিসা রুট তৈরির অনুসরণ করে। পিএইচডি শিক্ষার্থীরা দক্ষ কাজের ভিসা পদ্ধতি দিকে এগিয়ে চলেছে, যা যৌথভাবে যুক্তরাজ্যকে বিজ্ঞান পরাশক্তি এবং এসটিইএম বা স্টেম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) ক্ষেত্রে বিশ্বনেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে রয়েছে। গত দশ বছরে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পথে প্রায় সকল ভারতীয় ছাত্রের প্রায় অর্ধেক ২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত  প্রায় ১ লাখ ৩০,০০০ শিক্ষার্থীরা একটি করে স্টেমের অন্তর্ভূক্ত বিষয়গুলো বেছে নিয়েছে।

এদিকে ভিসা গ্র্যাজুয়েশন করার পরে কাজ করার বা কাজের সন্ধানের সুযোগ দেবে। তবে, ২০১২ সালে যে পদ্ধতিটি বন্ধ ছিল, তার বিপরীতে, এই নতুন পদ্ধতি কেবলমাত্র খাঁটি, বিশ্বাসযোগ্য শিক্ষার্থীই উপযুক্ত কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য সুরক্ষার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রতিটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা প্রকাশিত লাইসেন্সপ্রাপ্ত স্পনসরদের রেজিস্টারে প্রদর্শিত হবে ইউকে গভমেন্ট ওয়েবসাইট। এটি বিশ্বের শীর্ষ বিজ্ঞানীদের যুক্তরাজ্যে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দেওয়ার জন্য আগস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ইমিগ্রেশন বিধিগুলির একটি হস্তক্ষেপ। সর্বশেষ উপলব্ধ পরিসংখ্যান হোম অফিসের ওয়েবসাইটেও রয়েছে।

বিশেষত, চলতি বছরের জুন ২০১৯ সালের শেষের দিকে, প্রায় ২২ হাজার ভারতীয় শিক্ষার্থীকে ভিসা  দেওয়া হয়েছিল, এটি আগের বছরের চেয়ে ৪২% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জুন ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় ১০০% বেশি। তদুপরি, ৫ লাখের বেশি ভারতীয় নাগরিকদের  ভিজিট ভিসা দেওয়া হয়েছিল, সমস্ত ভিজিট ভিসার মধ্যে পাঁচটিতে ১ টিরও বেশি। ৫৬ হাজারেরও বেশি দক্ষ ভারতীয় কাজের ভিসা পেয়েছিলেন। এটি আগের বছরের তুলনায় ৫% বৃদ্ধি, এটিও যে কোনও ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি দেশ। এসটিইএম এবং এইচইএসএ স্টুডেন্ট রেকর্ড ২০০৭ থেকে ২০০৮ এবং ২০১৭ থেকে ২০১৮ ইউকেতে স্টেম বিষয় নিয়ে অধ্যয়নরত ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ব্রিটিশ কাউন্সিল দ্বারা সরবরাহ করা হয়েছিল। এই ডেটা এইচএসএ ওয়েবসাইটেও রয়েছে। ইউকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য দুই বছরের পড়াশোনার কাজের ভিসার ঘোষণা করেছে।